বোরো মৌসুমের আগে কৃষি ঋণ বিতরণ কমেছে ১৪ শতাংশের বেশি

কৃষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের মনোযোগ ঘাটতির প্রতিফলন

দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে কৃষি খাতের অবদান তাৎপর্যপূর্ণ। পাশাপাশি খাতটি খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম আধার। এর পরও এ খাত নানাভাবে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে এবং কৃষকরা নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন।

দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে কৃষি খাতের অবদান তাৎপর্যপূর্ণ। পাশাপাশি খাতটি খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম আধার। এর পরও এ খাত নানাভাবে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে এবং কৃষকরা নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর অন্যতম উদাহরণ হলো কৃষি ঋণ বিতরণের পরিমাণ কমে আসা। বিশেষ করে যখন কৃষকদের মাঝে এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা।

স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদনের মৌসুমগুলোয় কৃষি ঋণের প্রয়োজন হয় সবচেয়ে বেশি। যেমন আমন কিংবা বোরো ধান উৎপাদন মৌসুমে কৃষকদের মাঝে ধান চাষাবাদের জন্য অর্থের চাহিদা তৈরি হয়। আমন মৌসুম এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে। সামনে আসছে বোরো উৎপাদনের মৌসুম। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য জানাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) মাত্র ১৩ হাজার ৮১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় কৃষি ঋণ বিতরণ কমেছে ২ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা; যা শতাংশের হিসাবে ১৪ শতাংশের বেশি। আবার বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি খাতের জন্য নির্ধারিত ৩৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রার ৩৪ শতাংশ।

এদিকে কেবল বোরো উৎপাদন মৌসুমের কারণে ঋণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, এমন নয়। বিগত বছরের শেষার্ধে পরপর দুটি বন্যার কবলে পড়েছে দেশের বৃহৎ কয়েকটি অঞ্চল। এতে ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি খাত। সে সময় আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চাষাবাদে বিলম্ব হয়েছে। কোথাও পানি জমে থাকায় আবাদ ব্যাহত হয়েছে, যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে আমনের সার্বিক উৎপাদনে। একদিকে এ সময় বীজতলা নষ্ট হওয়ায় অনেক কৃষককে পুনরায় চাষাবাদ করতে হয়েছে। আবার উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে কৃষি উপকরণ ও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এ কারণে এবার কৃষকের ঋণের প্রয়োজনীয়তা আরো বেড়েছে।

অথচ কৃষকরা ধানের বীজতলা তৈরি করছেন এবং বন্যার কারণে আগে থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছেন এমন সময়ে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ না বেড়ে কমে যাওয়াটা আশঙ্কাজনক। অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদন কমলে দেশের সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে এবং চালের বাজার আরো বেশি অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।

এদিকে ঋণ বিতরণ কম হওয়া ছাড়াও বন্যা-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমেও তেমন গতি পরিলক্ষিত হয়নি। কৃষকরা যথাযথ প্রণোদনা পাননি। যেমন বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা ফেনীর প্রতি কৃষককে এক বিঘা জমি চাষাবাদে প্রয়োজনীয় সার ও বীজ বিনামূল্যে বিতরণ করেছে সরকার। কিন্তু একজন কৃষক শুধু এক বিঘার প্রণোদনা পেলেও বাকি জমিতে ঋণ করেই চাষাবাদ করতে হচ্ছে বলে বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যে কারণে প্রণোদনা কৃষকদের মাঝে তেমন উৎসাহ সৃষ্টি করতে পারেনি। অথচ অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা দেয়া গুরুত্বপূর্ণ খাতটির প্রতি বর্তমান সরকারের মনোযোগের এমন ঘাটতি একদমই অপ্রত্যাশিত।

সরকারের ভাবতে হবে কীভাবে দ্রুততার সঙ্গে কৃষি ঋণ বিতরণ বাড়ানো যায় এবং কৃষকদের ধান উৎপাদনে উৎসাহিত করা যায়। এখনো ঋণ বিতরণ বাড়িয়ে সুফল বয়ে আনা সম্ভব। কেননা এখনো ধানের বীজতলা তৈরির অবকাশ রয়েছে। সুতরাং এ সুযোগ কাজে লাগানো প্রয়োজন। এছাড়া ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও ব্যাংকগুলোর সফলতা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ঋণ পরিশোধের দিক থেকে বরাবরই কৃষি খাতের কার্যক্রম প্রশংসনীয় অবস্থানে থাকে। এবারো এ খাতে ঋণ বিতরণ কমলেও ঋণ আদায় আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর পর্যন্ত কৃষিতে ঋণ আদায় হয়েছে ১৬ হাজার ৬৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ আদায় হয়েছিল ১৪ হাজার ৪১৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। আবার খেলাপি ঋণও এ খাতেই সর্বনিম্ন। এর পরও কেন এ খাতে ঋণ বিতরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না, সেটি একটি বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

অবশ্য এ বিষয়ে কৃষি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সর্বশেষ বন্যায় অনেক এলাকায় চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ায় কৃষি ঋণের চাহিদা কমে থাকতে পারে। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং শেরপুর ও ময়মনসিংহের আকস্মিক বন্যায় প্রায় তিন লাখ হেক্টর আবাদি এলাকা কমেছে। নদীপাড়ের অনেক কৃষক জমিতে পুনরায় চাষাবাদ করতে পারেননি। যে কারণে অনেকের আর ঋণ নেয়ার প্রয়োজনও পড়েনি। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, ব্যাংকের নানা শর্তের কারণেও প্রান্তিক কৃষকরা ঋণের প্রতি আগ্রহী হন না। তাদের মতে, ঋণ ব্যবস্থাপনা সহজ হলে ঋণপ্রবাহ আরো বাড়ানো সম্ভব।

ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে জামানত একটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যে কারণে কৃষকরা ঋণের জন্য এনজিও এবং অনেক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপর বেশি নির্ভর করেন। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ঋণের জন্য কৃষকদের এনজিওগুলোর ওপর নির্ভরতাও সেভাবে বাড়েনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, এ সময় গ্রামীণ ব্যাংক এবং বড় ১০টি এনজিওর পক্ষ থেকে কৃষি খাতে ক্ষুদ্র ঋণ দেয়া হয়েছে ১৭ হাজার ৭৪৬ কোটি ১৩ লাখ টাকার, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেশি। এনজিও থেকে ঋণপ্রবাহ ইতিবাচক ধারায় থাকাটা একটি লক্ষণীয় বিষয়। সুতরাং ব্যাংকগুলোর বিষয়টি নিয়ে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে, যাতে কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো যায়। আবার ঋণের পরিমাণ কম বলে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে আগ্রহ না দেখানোর অভিযোগ রয়েছে, যা একদমই অনুচিত। বরং ব্যাংকগুলোর উচিত কৃষকের দোরগোড়ায় সহায়তা পৌঁছে দেয়া। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে আশু পদক্ষেপ নেয়া অত্যন্ত জরুরি।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কৃষক যেন সহজ শর্তে এবং সহজে ঋণ পেয়ে কৃষিকাজে অধিক মনোযোগী হন তা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ হয়। কোনো ব্যাংক যেন ঋণ বিতরণ থেকে বিরত না থাকে সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তদারক করতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বড় ব্যবসায়ীদের ঋণ দেয়ার তুলনায় কৃষককে ঋণ দেয়ার ঝুঁকি অনেক কম। কৃষক সাধারণত ঋণখেলাপি হন না। ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলেও তারা ঠিকই সময়মতো ঋণ পরিশোধ করেন। এ কারণে দেশব্যাপী এনজিওগুলো তাদের ঋণ কার্যক্রমের বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। অথচ এখানে ব্যাংকগুলো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারত। সরকারের এদিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। কেবল ঋণ বিতরণ নয়, সার্বিক উৎপাদনে যাতে কৃষি উৎপাদন চাপের মুখে না পড়ে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

সর্বোপরি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, কৃষি খাতকে উপেক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য কৃষি খাতকে সমগুরুত্ব দিতে হবে। কৃষক সহজ শর্তে ঋণ পাবেন এবং চড়া সুদে ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তা ছাড়াই ফসল উৎপাদন করবেন, যথাযথ প্রণোদনা পাবেন—এটিই প্রত্যাশা।

আরও